 |
আল কুরআন ও হাদীসের আলোকে সততা ও সত্যনিষ্ঠা |
সততা ও সত্যনিষ্ঠা মানব চরিত্রের
মহৎ গুণ। যা একজন সাধারণ মানুষকে আদর্শবান মানুষে পরিণত করে। কথা, কাজ, চিন্তা ও আচরণে, তথা জীবন পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে
সততার অনুশীলন বা চর্চা করতে হয়। এটি মুমিনের ভূষণ, মানুষের আস্থার প্রতীক এবং
মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও পুরস্কার প্রাপ্তির উপায়। কাজেই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের
জন্য জীবনের সর্বক্ষেত্রে সততা অবলম্বন ও সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই। ইংরেজীতে
একটি প্রবাদ আছে Honesty is the best policy, অর্থাৎ সততাই সর্বোত্তম পন্থা। কুরআনুল কারীমে সততাকে অত্যন্ত বড় গুন হিসেবে গুরুত্বারোপ
করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সততা ও সত্য
নিষ্ঠার উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি এ বিষয়ে আমাদেরকে প্রবল উৎসাহ দান করেছেন।
আল কুরআন ও হাদীসের আলোকে সততা ও
সত্যনিষ্ঠা
ক।
কুরআনের আদেশ
মহান আল্লাহর নির্দেশ তোমরা
সৎ ও সত্যনিষ্ঠ হও। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন এর সূরা মায়েদায় আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ
ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّمِينَ لِلَّهِ شُهَدَآءَ بِٱلْقِسْطِ ۖ وَلَا
يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَـَٔانُ قَوْمٍ عَلَىٰٓ أَلَّا تَعْدِلُوا۟ ۚ ٱعْدِلُوا۟ هُوَ
أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا
تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য সত্য ও ন্যায়ের উপর সাক্ষী হয়ে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের
শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই আল্লাহভীতির অধিক
নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। (মনে রেখ) তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে
অবগত। (সূরা আল মায়েদা-৮)
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)
হতে বর্ণিত হয়েছে,
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ قَالَ
رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم عليكم بالصدق فَإِنَّ الصَّدْقَ يَهْدِي إِلَى
الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ
يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصدقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِندَ اللهِ صَدِيقًا وَإِيَّاكُمْ
وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ
يَهْدِي إِلى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الْعَبْدُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ
حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا.
তোমরা অবশ্যই সত্যের পথ অবলম্বন
করবে। কেননা, সততাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। আর কল্যাণ জান্নাতের দিকে
নিয়ে যায়। কোন মানুষ প্রতিনিয়ত সত্য কথা বলতে থাকলে এবং সত্যের প্রতি মনোযোগী থাকলে
শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহ তা'আলার দরবারে পরম সত্যবাদী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।
তোমরা মিথ্যাকে অবশ্যই পরিহার করবে। কেননা, মিথ্যা (মানুষকে) পাপের পথ
দেখায়, আর পাপ জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। কোন বান্দাহ প্রতিনিয়ত মিথ্যা
বলতে থাকলে এবং মিথ্যার প্রতি ঝুঁকে থাকলে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহ তা'আলার দরবারে চরম মিথ্যাবাদী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। (তিরমিযী-১৯৭১)
খ। সত্যবাদীদের
সাহচর্য গ্রহণের নির্দেশ
মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ
وَكُونُوا مَعَ الصَّادقين
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক। (সূরা আত্ তাওবা-১১৯)
উল্লিখিত আয়াতের সমার্থবোধক
বাংলায় ও একটি প্রবাদ আছে "সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ"।
গ। সত্যবাদীদের
বৈশিষ্ট্য
মহান আল্লাহ সত্যবাদী ও মুত্তাকীর
পরিচিতি তুলে ধরে বলেন:
لَّيْسَ ٱلْبِرَّ أَن تُوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ قِبَلَ ٱلْمَشْرِقِ
وَٱلْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ ٱلْبِرَّ مَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ
وَٱلْمَلَٓئِكَةِ وَٱلْكِتَبِ وَٱلنَّبِيِّۦنَ وَءَاتَى ٱلْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِۦ
ذَوِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَمَىٰ وَٱلْمَسَكِينَ وَٱبْنَ ٱلسَّبِيلِ وَٱلسَّآئِلِينَ
وَفِى ٱلرِّقَابِ وَأَقَامَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَى ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلْمُوفُونَ
بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَهَدُوا۟ ۖ وَٱلصَّبِرِينَ فِى ٱلْبَأْسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ
وَحِينَ ٱلْبَأْسِ ۗ أُو۟لَٓئِكَ ٱلَّذِينَ صَدَقُوا۟ ۖ وَأُو۟لَٓئِكَ هُمُ ٱلْمُتَّقُونَ
সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত
নবী-রাসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকীন,
মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে।
আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী
এবং অভাবে, রোগে-শোকে, সংকটে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার। (সূরা আল বাকারা ১৭৭)
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ
وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ
فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ
তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর
পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (সূরা আল হুজুরাত ১৫)
ঘ। সত্যকে মিথ্যার
সাথে মিশ্রিত করা নিষেধ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
وَلَا
تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُوْنَ
তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে
মিশিয়ে দিওনা এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে গোপন করো না। (সূরা আল বাকারা ৪২)
সত্য হলো আলোর পথ আর মিথ্যার
পথ হলো অন্ধকার। সত্যবাদিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো সত্য। অর্থাৎ সত্য চিরকাল প্রকাশমান
থাকে। শুধু মিথ্যা না বলা বোঝাতে সত্যবাদিতা বোঝায় না। সত্যকে অবলম্বন করে যে বৈশিষ্ট্য
বিকশিত হয় তার নাম সত্যবাদিতা। সত্যের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা নেই। সত্য জীবনের স্বরূপ
বিকশিত করে। সত্যবাদী লোকের কথা ও কাজে কোনো পার্থক্য থাকে না। সত্যবাদিতা মানুষকে
খাঁটি সোনার মত নিখাদ করে তোলে। সত্যের মাধ্যমে মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যের মধ্য
দিয়েই মানুষ অর্জন করে সততা। সত্যকে অবলম্বন করলে জীবনে সাফল্য অনিবার্য।
জ। কথা ও কাজে
সত্যনিষ্ঠ হওয়া
সৎ ও সত্যনিষ্ঠ হতে হলে কথা
ও কাজে সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। এ ছাড়াও নিম্নোক্ত গুণ থাকা আবশ্যক:
ক। সর্বদা সত্য কথা বলা, মিথ্যা না বলা।
খ। সত্য সাক্ষ্য প্রদান করা
এবং মিথ্যা সাক্ষ্য না দেয়া।
গ। মিথ্যা শপথ না করা।
ঝ। মিথ্যা বলা
ও অসৎ পন্থা অবলম্বন করা মুনাফিকের আলামত বিশেষ
মুনাফিকের আলামত/ নিদর্শন
সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীসে আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
وَعَنْ عَبدِ اللهِ بنِ عَمرِو بنِ العَاصِ رَضِيَ
اللهُ عَنْهُمَا : أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ كَانَ
مُنَافِقًا خَالِصًا وَمَنْ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِّنْهُنَّ كَانَ فِيهِ
خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتّٰـى يَدَعَها : إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا
حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ متفق عَلَيْهِ
চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান
সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত
রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি করে।
(মুসলিম ১/২৫ হাঃ ৫৮, আহমাদ ৬৭৮২, বুখারী-৩৪, ই.ফা. ৩৩, (আঃ) প্র. ৩৩,)
উল্লিখিত ৪ টি মন্দ স্বভাবই
সততা ও সত্যনিষ্ঠার সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাব। এই মন্দ স্বভাব থেকে আমাদের অবশ্যই দূরে
থাকতে হবে।
ঙ। মিথ্যা সাক্ষ্য
শিরকতুল্য পাপ
মিথ্যার কুফল ও গুনাহ সম্পর্কে
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَٱجْتَنِبُوا۟ ٱلرِّجْسَ مِنَ ٱلْأَوْثَنِ وَٱجْتَنِبُوا۟
قَوْلَ ٱلزُّورِ
সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা
থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা বলা থেকে দূরে সরে থাকো। (সূরা আল হাজ্জ ৩০)
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম
বুখারী (রাহি.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন; যাতে মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা
সাক্ষ্য দেয়াকে কবীরা গুনাহ এবং শিরকতুল্য বলা হয়েছে। হাদীসটি নিম্নরূপ:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم "
أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ". قُلْنَا بَلَى يَا
رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ " الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ
الْوَالِدَيْنِ ". وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ " أَلاَ
وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ، أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ
الزُّورِ ". فَمَا زَالَ يَقُولُهَا حَتَّى قُلْتُ لاَ يَسْكُتُ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি কি তোমাদের সব থেকে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? আমরা বললামঃ অবশ্যই সতর্ক করবেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ আল্লাহর সঙ্গে কোন
কিছুকে অংশীদার গণ্য করা, পিতা-মাতার নাফরমানী করা। এ কথা বলার সময় তিনি হেলান
দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর (সোজা হয়ে) বসলেন এবং বললেনঃ মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য
দেয়া, দু'বার করে বললেন এবং ক্রমাগত বলেই চললেন। এমনকি আমি
বললাম, তিনি মনে হয় থামবেন না। (বুখারী ৫৯৭৬, তিরমিযী ২৬৫৪)
বিজ্ঞ ইমামগণের মতে কোনো ব্যক্তি
যদি মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা বলে প্রমাণিত হয় তাহলে তার নাম পরিচয় প্রচার মাধ্যমে প্রচার
করে দিতে হবে যেন তার থেকে সর্তক থাকা যায় (কুরতুবী)।
অন্য হাদিস শরিফে এসেছে,
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)
বলেন, তার পিঠে চাবুক মারতে হবে, মাথা ন্যাড়া করে দিতে হবে, মুখে চুনকালি মেখে দিতে হবে; অতঃপর তাকে কারাগারে বন্দী করতে হবে। এটিই হবে তার
উপযুক্ত শান্তি। (বাইহাকী-মারিফাতুস সনানি ওয়াল আছার-১৪/২৪৩)
সততা ও সত্যনিষ্ঠা অর্জনের উপায়সমূহ
সিদক বা সততা হলো সৎ চরিত্রের
প্রধান ভূষণ এটি এমন একটি মহৎ গুন যা আর্দশবান মানুষের জন্য অপরিহার্য। সততা ও সত্যনিষ্ঠার
সম্পর্ক যেমনিভাবে কথা ও কাজের সাথে সম্পৃক্ত, তেমনিভাবে তা অন্তর ও আমলের
সাথেও সম্পৃক্ত। এ বিবিধ দিক থেকেই বলা যায়, আদর্শবান মানুষের মাঝে সততা
ও সত্যনিষ্ঠার গুণের সমন্বয় থাকতে হবে। এটি মুমিনের এমন এক মহৎ গুন যা সত্যবাদীর অনুভূতি
বোধ, বিশ্বাস, কথা-বার্তা, আচরণ ও কর্মপরিধিতে পরিস্ফুট
হয়ে থাকে। সত্যবাদী ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ, কর্তব্যপরায়ণ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণ ইখলাছ তথ্য আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার
আয়না সাদৃশ। তাই তাকে বলা হয় সিদ্দীক বা সত্যবাদী। মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে নবীগণের পরই
সিদ্দীক বা সত্যবাদীগণের স্থান। নিম্নে সততা ও সত্যনিষ্ঠা অর্জনের উপায় সর্ম্পকে আলোচনা
করা হলো:
ক। পারিবারিক
শিক্ষা
সততা ও সত্যনিষ্ঠার চিন্তা, চেতনা, অনুভূতির প্রথম শিক্ষা মূলত পরিবার থেকেই সূত্রপাত হয়। বিশেষ
করে পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন গৃহ শিক্ষকের নৈতিক মান ও আর্দশ, সততা ও সত্যবাদিতা, ন্যায়-নীতি সবকিছুর গভীর প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর।
মহামতি লুকমান হাকীম (আঃ) তার প্রিয় সন্তানকে যেসব মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিলেন তার একটি
ছিল নীতি-নৈতিকতা ও তাক্বওয়ার অনুভূতি জাগ্রত করার বিষয়ে। যেমনঃ কুরআনুল কারীমে সূরা
লোকমানে বর্ণিত হয়েছে:
يَا بُنَيَّ إِنَّهَا
إِن تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُن في صخرة أو في السَّماوات أو
في الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ
হে বৎস, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে
অথবা ভূ-গর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষদর্শী, সবকিছুর খবর রাখেন। (সূরা লুকমান-১৬)
মহানবী (সাঃ) ছিলেন মানবতার
মহান শিক্ষক, তিনি তার প্রিয় দৌহিত্র হাসান ইবনে আলী (রাঃ) কে শিশুকালে যে
শিক্ষাদান করেছিলেন তা এ বর্ণনা থেকে উপলব্ধি করা যায়:
عن أبي الحَوْرَاءِ
السَّعْدِي، قَالَ قُلْتُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيَّ مَا حَفِظَتْ مِنْ رَسُولِ الله
صلى الله عليه وسلم قال حفظت مِنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم دَع ما يريبك
إلى ما لا يُرِيبُكَ فَإِنَّ الصدْقَ طَمَأْنِينَةً وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةً
আবুল হাওরা আস-সাদী (রহঃ)
হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান ইবনু আলী (রাঃ)-কে আমি প্রশ্ন করলাম, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কোন কথাটা মনে রেখেছেন? তিনি বললেন,
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর
এই কথাটি মনে রেখেছি: যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দিয়ে যাতে সন্দেহের
সম্ভাবনা নেই তা গ্রহণ কর। যেহেতু, সত্য হলো শান্তি ও স্বস্তি এবং মিথ্যা হলো দ্বিধা-সন্দেহ।
(তিরমিযি-২৫১৮)
মহানবী (সাঃ) নিজে ছিলেন আল-আমীন
বা পরম সৎ ও বিশ্বস্ত। আমরা তারই উম্মাত। সুতরাং পরিবার হউক আমাদের নৈতিক শিক্ষার প্রধান
ও প্রাথমিক স্তর। আশা করা যায় এর মাধ্যমে আমাদের সন্তানরা সত্যতা ও সত্যনিষ্ঠার শিক্ষা
গ্রহণ করতে পারে।
খ। প্রাতিষ্ঠানিক
নৈতিক শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব
সততা ও সত্যনিষ্ঠা অর্জনের
আরেকটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে যথার্থ নৈতিক শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতমান।
সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চরিত্র গঠনের জন্য ইসলামী নৈতিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। যেহেতু
আমরা দ্বীন আল ইসলামে বিশ্বাসী তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের নৈতিকতার মানদন্ড হতে হবে
দ্বীন আল ইসলাম। এর পরে আসবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ। আর একজন সেনাসদস্যের জন্য সেই
সাথে আরো যুক্ত হবে সেনাবাহিনীর চেতনা ও মূল্যবোধ। এখানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ Stanli Hull এর বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেছেন- If you each your
children's three "R" (Reading) Writing and arithmetic) and leave the Fourth
"R" (Religion) you will get fifth "R" Rascality. (যদি তুমি তোমার সন্তানকে তিনটি '২" শিক্ষা দান করো এবং চতুর্থ "R" কে পরিত্যাগ করো, তাহলে সে পঞ্চম "IR" বেয়াড়া বা অবাধ্য হবে) এছাড়াও সততা ও সত্যনিষ্ঠার চেতনা ও অনুভূতি সৃষ্টির পিছনে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষকগণের নৈতিক চরিত্রের প্রভাব, শিক্ষা কারিকুলাম এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনেকাংশে ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের শিশু
কিশোর মনে সেই আদর্শ শিক্ষা প্রদান এবং তাদেরকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা
খুব কমই লক্ষনীয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা কিতাবের নীতি কথা বাস্তবে খুঁজে পায় না। তাই আমাদেরকে
প্রতিটি ক্ষেত্রে শুধু নীতি কথা নয় বরং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোর শিক্ষাই দিতে
হবে।
গ। সাধনা ও
অধ্যাবসায়
যেহেতু মানুষ তার জীবনের সৎ
গুনাবলী জন্মগতভাবে প্রাপ্ত হন না তাকে তা অর্জন করে নিতে হয়। তাই আমাদেরকে সততা ও
সত্যনিষ্ঠার গুনাবলি চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে অর্জন করে নিতে হবে। আরবি প্রবাদে আছে 'মান জাদ্দা ফাওয়াজাদা' অর্থ যে চেষ্টা করে সে পায়।
وَأَن لَّيْسَ
لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা
করে। (সূরা আন-নাজম-৩৯)
সততার পুরস্কার
সত্যবাদী ও সৎ ব্যক্তির বিচার
দিবসে মহাপুরস্কার সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেন:
قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ
جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ
اللَّهُ عَنْهُمْ رَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
আল্লাহ বলবেন আজকের দিনে সত্যবাদীদের
সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে জান্নাত রয়েছে, যার তলদেশে নির্ঝরনী প্রবাহিত হবে; তারা তাতেই চিরকাল থাকবে।
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটিই মহা সাফল্য।
(সূরা আল মায়েদা-১১৯)
ইংরেজিতে একটি বিখ্যাত প্রবাদ
আছে- Honesty is the best policy 'সততাই সর্বোত্তম পন্থা'। তাই এর পুরস্কার অবধারিত। আখিরাতে মহাসংকট কালে
যেদিন সকলে অত্যন্ত পেরেশানিতে থাকবে সে দিন সত্যনিষ্ঠ্যদের মহা সম্মানে সয়ং আল্লাহ
পুরষ্কৃত করবেন। এছাড়া মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সততা ও সত্যনিষ্ঠার
কল্যাণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
ক। সততাই মানুষকে
কল্যানের পথে ধাবিত করে
إِنَّ الصِّدْقَ
يَهْدِي إلى البر
খ। আর কল্যান
জান্নাতের পথে চালিত করে
وَإِنَّ
الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يَكُوْنَ
صِدِّيقًا
আর মানুষ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত
থাকলে অবশেষে সে সিদ্দিক বা সত্যবাদীদের মর্যাদা লাভ করে। (বুখারী-৬০৯৪)
গ। মিথ্যার ফলাফল
ক্ষণস্থায়ী
সমাজে সত্যের জয় অবধারিত এবং
মিথ্যার পরাজয় নিশ্চিত। আপাত দৃষ্টিতে মিথ্যার জয় প্রতিয়মান হলেও স্থায়ী নয় বরং সত্যের
প্রকাশ এক সময় অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং পরিণামে সত্যের বিজয় ঘোষনা হয়। সত্যনিষ্ঠরা পরম
ধৈর্য সহকারে সততার অনুসরণ করে এবং পরিনামে জয়লাভ করে। সৎ ব্যক্তি সাময়িক দুঃখ কষ্টে
জীবন অতিবাহিত করলেও ব্যক্তি জীবনে সফল ও কৃতকর্মে তৃপ্ত এবং আনন্দ লাভ করে। মহাকাল
সৎ পথের যাত্রীদের নামই লিখে রাখে অসৎ ব্যক্তিদের মহাকালের বুকে
ঠাঁই নাই, তারা নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। সততাই সত্য, আসল এবং খাঁটি। এর রূপের কোন পরিবর্তন নেই। মিথ্যার রয়েছে প্রলোভন, ছলচাতুরি। হিরা রং বদল করেনা বলেই মূল্যবান, মুক্তা তা করে বলেই তার দাম
কম। সত্যই জীবনকে পরিপূর্ণ বিকশিত করে।
ঙ। সততা ও সত্যনিষ্ঠ হওয়ার জন্য আমাদের করণীয়
জীবনকে অবশ্যই সত্যবাদিতার
মাধুর্য্যে মন্ডিত করতে হবে। অন্যায়ের মাধ্যমে বা অবৈধ উপায়ে যতই বিত্তশালী হোক না
কেন তা যে পাপ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অসত্যের পরাজয় আসবেই ও ন্যায়ের পথ চির উজ্জল থাকবেই।
সৎ ব্যক্তি নৈতিক শক্তির বলে
বলীয়ান। সত্যতায় বিশ্বাসী বলেই সে সমাজের অন্ধ মায়ার মোহে পথভ্রষ্ট হয় না, হাজার প্রলোভনে সত্যভ্রষ্ট হয় না। সে লোভী, ঠক ও প্রতারক নয় বলে জীবনে
পাওয়া না পাওয়ার বেদনায় কখনোই হতাশ হননা। সর্বক্ষণই তার হৃদয় মনে শান্তির পরশ বিরাজ
করে। মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশিত হয় সততার গুণে। সে জন্য সততা ও সত্যনিষ্ঠার অনুশীলন
করতে হবে এবং জীবনে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে যথার্থ মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে হবে। সমাজে
সততাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, মানুষকে নৈতিক বলে বলিয়ান হতে হবে। পরিবার, সমাজ জীবন, এমনকি কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সৎ ব্যক্তির মূল্যায়ন করতে
হবে। সৎ ব্যক্তির মূল্যায়ন ব্যতিত কখনও সমাজ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, সর্বকালের মহামানব, মহাপুরুষ, মানব মুক্তির অগ্রদূত হযরত
মুহাম্মদ (সাঃ) সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর সমস্ত জীবন নানা দুঃখ কষ্ট সহ্য করে কঠোর
সাধনায় মগ্ন ছিলেন। সত্যের সাধনায় তিনি ছিলেন অটল, অবিচল। হাজার দুঃখ-যন্ত্রনায়ও
তিনি সত্যের পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। সত্যের সাধনার বলে তিনি শত্রু-মিত্র সবার কাছে
আল আমিন বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত হন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সততা ও সত্য নিষ্ঠার
উপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন।
Download Button
PDF Download Now