অপব্যয়-অপচয় রোধ ও মিতব্যয়িতা প্রসঙ্গে ইসলাম | জুমুয়ার খুতবা
![]() |
| অপব্যয়-অপচয় রোধ ও মিতব্যয়িতা প্রসঙ্গে ইসলাম |
অপব্যয় ও অপচয়ের পরিচয়
আরবি ভাষায় অপব্যয় ও অপচয় বোঝাতে প্রধানত দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়: ১. ইসরাফ (الإسراف) ২. তাবযীর (التبذير)
ক. ইসরাফ (الإسراف): আরবি ‘ইসরাফ’ শব্দের অর্থ সীমালঙ্ঘন, অপচয়, অপব্যয়, অমিতব্যয়িতা, বাড়াবাড়ি বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত
ব্যয় করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
كُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
তোমরা
এগুলোর ফল খাও যখন তা ফলবন্ত হয় এবং ফসল কাটার দিনে এর হক্ব (যাকাত/ওশর) আদায়
করো। আর তোমরা অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। (আল আনআম ৬:১৪১)
‘ইসরাফ’-এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় তাবেঈ কাতাদাহ (রহ.) বলেন:
الإِسْرَافُ: إِنْفَاقُ الْمَالِ فِي مَعْصِيَةِ
اللَّهِ، وَفِي غَيْرِ الْحَقِّ، وَفِي الْفَسَادِ
আল্লাহর
নাফরমানি, অন্যায় খাত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কাজে অর্থ ব্যয় করাকেই অপচয় (ইসরাফ)
বলে। (তাবারী: ১৪/৩১৭)
আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন:
الإِسْرَافُ هُوَ الصَّرْفُ فِيْمَا يَنْبَغِي
زَائِدًا عَلَى مَا يَنْبَغِي
অনুমোদিত
বা বৈধ খাতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় করাকে অপচয় বলে। (উমদাতুল ক্বারী: ২৫/১৯)
তিনি আরও
বলেন:
مَنْ أَنْفَقَ دِرْهَمًا فِي غَيْرِ حَقِّهِ
فَهُوَ سَرَفٌ
যে
ব্যক্তি অকল্যাণকর বা অনর্থক কাজে এক দিরহামও খরচ করল, সে-ই
অপচয় করল। (জামি‘লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী: ১৩/৭৩)
ভাষাবিদ
শরীফ আলী আল-জুরজানী (রহ.) ‘ইসরাফ’-এর সংজ্ঞায় লিখেছেন:
الإِسْرَافُ هُوَ إِنْفَاقُ الْمَالِ الْكَثِيرِ
فِي الْغَرَضِ الْخَسِيسِ، وَتَجَاوُزُ الْحَدِّ فِي النَّفَقَةِ، وَقِيلَ: أَنْ يَأْكُلَ
الرَّجُلُ مَا لَا يَحِلُّ لَهُ، أَوْ يَأْكُلَ مِمَّا يَحِلُّ لَهُ فَوْقَ الِاعْتِدَالِ
وَمِقْدَارِ الْحَاجَةِ
‘ইসরাফ’ হলো কোনো তুচ্ছ বা অকল্যাণকর উদ্দেশ্যে প্রচুর ধন-সম্পদ ব্যয় করা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে
সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। কেউ কেউ বলেন: কোনো ব্যক্তির হারাম বস্তু ভক্ষণ করা অথবা হালাল
বস্তু প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ও অপরিমিত আহার করা। (কিতাবুত তা‘রীফাত, পৃ. ৩৮)
খ. তাবযীর (التبذير): ‘তাবযীর’ শব্দের অর্থ অপব্যয়, বাজে খরচ
বা অহেতুক ব্যয় করা। এর ব্যুৎপত্তিগত মূল অর্থ হলো (إِلْقَاءُ الْبَذْرِ وَطَرْحُهُ) অর্থাৎ ‘বীজ ছিটানো বা ফেলে দেওয়া’। রূপক অর্থে অনর্থক সম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নষ্ট করা বোঝাতে শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হয়।
(আল-মুফরাদাত, রাগেব ইসফাহানী, পৃ. ১৪০)
পবিত্র
কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন:
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ
كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
আর
কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর
শয়তান হলো তার রবের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ। (আল ইসরা ১৭:২৬-২৭)
আব্দুল্লাহ
ইবনে মাসউদ (রাযি.) ‘তাবযীর’-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
التَّبْذِيْرُ هُوَ إِنْفَاقُ الْمَالِ فِي غَيْرِ
حَقِّهِ
অন্যায়, অবৈধ বা
অনর্থক খাতে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করাকেই অপব্যয় (তাবযীর) বলে। (তাবারী: ১৫/৫০২)
ফকীহগণের
মতে: "সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার না করে অযোগ্য ও অনুচিত কাজে তা ব্যয় করাই হলো
তাবযীর।" (তাহরীরু আলফাযিত তানবীহ, ইমাম নববী, পৃ. ২০০)
অপব্যয় ও অপচয়ের মূল কারণসমূহ
মানুষের
জীবনে অপচয় ও অপব্যয়ের একাধিক কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি কারণ নিচে
উল্লেখ করা হলো:
১. দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা: শরীয়তের সঠিক জ্ঞান না থাকার
কারণেই মানুষ অবলীলায় অপচয় করে থাকে। কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক অনুধাবন থাকলে একজন
মুমিন কখনোই অপচয়কারী হতে পারে না। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) বলেছেন:
عَنْ ابْنِ مَسْعُودٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى
اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ،
وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ،
وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ»
কিয়ামতের
দিন কোনো আদম সন্তান তার রবের নিকট থেকে এক কদমও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ
না তাকে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হয়:
১. তার
আয়ুষ্কাল সম্পর্কে—কী কাজে তা নিঃশেষ করেছে;
২. তার
যৌবনকাল সম্পর্কে—কীভাবে তা ক্ষয় করেছে;
৩. তার
সম্পদ সম্পর্কে—কোন উৎস থেকে তা উপার্জন করেছে;
৪.
উপার্জিত সম্পদ—কোন পথে ব্যয় করেছে; এবং
৫.
অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী—কী পরিমাণ
আমল করেছে। (তিরমিযী শরীফঃ ২৪১৬)
২. পারিবারিক প্রভাব ও পরিবেশ: শৈশবে শিশুরা পিতা-মাতা ও
পরিবারের আচরণ দেখে বড় হয়। পিতা-মাতা যদি অপচয়কারী ও বিলাসী হন, তবে
সন্তানরাও সেই অভ্যাসে গড়ে ওঠে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়া আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ করেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ
قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ
عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ»
অনুবাদ:
প্রতিটি নবজাতকই প্রাকৃতিক ধর্ম (ইসলাম/ফিতরাত)-এর ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার
পিতা-মাতা তাকে ইহুদী,
খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে। (বুখারী শরীফঃ ১৩৮৫)
৩. অপচয়কারীদের সঙ্গ লাভ: মানুষ স্বভাবতই তার সঙ্গীদের
দ্বারা প্রভাবিত হয়। বন্ধুদের মধ্যে অপচয় ও অপব্যয়ের প্রবণতা থাকলে অন্যরাও তা
অনুকরণ করতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্কতা
বাণী উচ্চারণ করে বলেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى
اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ
أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ»
অনুবাদ:
মানুষ তার বন্ধুর দ্বীন বা জীবনরীতির অনুসারী হয়ে থাকে। অতএব, তোমাদের
প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য রাখে সে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে। (আবু দাউদ শরীফঃ ৪৮ ৩৩)
৪. পরকাল ও হিসাব-নিকাশের প্রতি উদাসীনতা: আখিরাতের
জবাবদিহিতা ও হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার কথা ভুলে যাওয়াই অপব্যয়ের অন্যতম কারণ। যে
ব্যক্তি মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ও হিসাব দেওয়ার ভয় অন্তরে রাখে, সে কখনো
অপচয় করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান সম্পর্কে ঘোষণা করেন:
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى
النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
অনুবাদ:
আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে
নিজেকে বিরত রেখেছে,
জান্নাতই হবে তার চূড়ান্ত ঠিকানা। (আন নাযিআত ৭৯:৪০-৪১)
অপব্যয় ও অপচয়ের খাতসমূহ
অপব্যয়
ও অপচয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং এ সংক্রান্ত ইসলামী দিকনির্দেশনা নিচে বিস্তারিত
আলোচনা করা হলো:
ক. পানাহারে অপচয়
জীবনের
স্বাভাবিক গতি সচল রাখার জন্য খাদ্য অপরিহার্য। তবে সে ক্ষেত্রে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু
খাদ্য গ্রহণ করাই ইসলামের বিধান। ইসলামে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বস্তু গ্রহণ এবং
মাত্রাতিরিক্ত পানাহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَلَا
تَطْغَوْا فِيهِ فَيَحِلَّ عَلَيْكُمْ غَضَبِي وَمَنْ يَحْلِلْ عَلَيْهِ غَضَبِي فَقَدْ
هَوَى
আমি
তোমাদেরকে যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও এবং এতে সীমালঙ্ঘন করো না; করলে
তোমাদের ওপর আমার গজব নেমে আসবে। আর যার ওপর আমার গজব নেমে আসে, সে তো
ধ্বংসই হয়ে যায়। (সূরা ত্বাহা ২০:৮১)
কেবলমাত্র
মানসিক ইচ্ছা, স্বাদ বা লোভ মেটানোর জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করাও অপচয়ের
অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنَ السَّرَفِ أَنْ تَأْكُلَ كُلَّ
مَا اشْتَهَيْتَ
আনাস
(রাযি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমার যা
খেতে মনে চাইবে তা-ই খাওয়া অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। (ইবনে মাজাহ শরীফ: ৩৩৫২)
عَنْ مِقْدَامِ بْنِ مَعْدِيكَرِبَ قَالَ:
سَمِعْتُ
رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ
بَطْنٍ، بِحَسْبِ ابْنِ آدَمَ أُكُلَاتٌ يُقِمْنَ صُلْبَهُ، فَإِنْ كَانَ لَا مَحَالَةَ
فَثُلُثٌ لِطَعَامِهِ وَثُلُثٌ لِشَرَابِهِ وَثُلُثٌ لِنَفَسِهِ
মিকদাম
ইবনে মা'দীকারিব (রাযি.)
বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে
বলতে শুনেছি:
মানুষ পেট অপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না।
পিঠের ধারা সোজা রাখার জন্য আদম সন্তানের জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি
অতিরিক্ত খেতেই হয়,
তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ
পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য নির্দিষ্ট রাখবে। (তিরমিযী শরীফ: ২৩৮৩)
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا بَعَثَ بِهِ إِلَى الْيَمَنِ قَالَ:
إِيَّاكَ
وَالتَّنَعُّمَ فَإِنَّ عِبَادَ اللهِ لَيْسُوا بِالْمُتَنَعِّمِينَ
মুআজ বিন
জাবাল (রাযি.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ইয়েমেনের গভর্নর করে
পাঠানোর সময় অসিয়ত করেন: খবরদার! ভোগ-বিলাসিতা
থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা আল্লাহর খাঁটি বান্দারা বিলাসী হয় না। (মুসনাদে আহমাদ শরীফ: ২২১০৫)
খাবারের
অপচয় রোধে দিকনির্দেশনা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
নির্দেশ করেছেন:
إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ
مَا كَانَ بِهَا مِنْ أَذًى وَلْيَأْكُلْهَا وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ
যখন
তোমাদের কারও খাবারের লোকমা পড়ে যায়, সে যেন তার ময়লা দূর করে তা
খেয়ে ফেলে এবং শয়তানের জন্য তা ফেলে না রাখে। (তিরমিযী শরীফ: ১৯১৬)
ধূমপান ও
বিভিন্ন মাদকদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপব্যয় হয়। ইসলাম সব
ধরনের ক্ষতিকর ও হারাম খাদ্য-পানীয় নিষিদ্ধ করেছে। আধুনিক ফকীহ ও
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে,
যেসব খাদ্য ও পানীয় স্বাস্থ্যের জন্য নিশ্চিত ক্ষতিকর, তা গ্রহণ
করা মুমিনের জন্য হারাম। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেছেন:
كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ
حَرَامٌ
প্রতিটি
নেশাজাতীয় দ্রব্যই খামর (মাদক) এবং প্রতিটি মাদকদ্রব্যই হারাম। (মুসলিম শরীফ: ২০০৩)
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ
اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثَةٌ قَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِمُ
الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَالْعَاقُّ، وَالدَّيُّوثُ الَّذِي
يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخُبْثَ
আব্দুল্লাহ
ইবনে ওমর (রাযি.)
হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেন: তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাত হারাম করেছেন—মাদকাসক্ত ব্যক্তি, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং
দাইয়ুস (যে ব্যক্তি নিজের পরিবারে অনাচার-অশ্লীলতা প্রশ্রয় দেয়)। (মুসনাদে আহমাদ শরীফ: ৫৩৭২)
খ. পানি,
বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে অপচয়
পানির
অপর নাম জীবন। প্রতিনিয়ত অসচেতনতার কারণে আমাদের মাধ্যমে অনেক পানি অপচয় হয়।
পানির ট্যাংক উপচে পড়া,
ওজু বা গোসলের সময় অপ্রয়োজনে ট্যাপ ছেড়ে রাখা ইত্যাদি
অপচয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। হাদিসে এসেছে:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو أَنَّ النَّبِيَّ
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِسَعْدٍ وَهُوَ يَتَوَضَّأُ، فَقَالَ:
مَا
هَذَا السَّرَفُ يَا سَعْدُ؟ قَالَ: أَفِي الْوُضُوءِ سَرَفٌ؟ قَالَ:
نَعَمْ،
وَإِنْ كُنْتَ عَلَى نَهَرٍ جَارٍ
আব্দুল্লাহ
ইবনে আমর (রাযি.)
হতে বর্ণিত, নবী کریم (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন সা'দ (রাযি.)-এর পাশ
দিয়ে যাচ্ছিলেন,
তখন তিনি ওজু করছিলেন। মহানবী (সা.) বললেন: হে সা'দ, এ কেমন অপচয়?
সা'দ (রাযি.) জিজ্ঞেস করলেন: ওজুতেও কি অপচয় হয়? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তুমি
বহমান নদীতে বসে ওজু করলেও অতিরিক্ত পানি ব্যয় করলে তা অপচয় হবে। (ইবনে মাজাহ শরীফ: ৪২৫)
গ. পোশাক-পরিচ্ছদ ও বাসস্থান নির্মাণে অপচয়
পোশাকের প্রধান উদ্দেশ্য হলো লজ্জাস্থান আবৃত করা, শারীরিক সৌন্দর্য রক্ষা করা এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতা থেকে আত্মরক্ষা করা। কিন্তু অহংকার প্রদর্শন, লোকদেখানো কিংবা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে পোশাক পরিধান করা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
كُلُوا وَاشْرَبُوا وَتَصَدَّقُوا وَالْبَسُوا
فِي غَيْرِ مَخِيلَةٍ وَلَا سَرَفٍ
তোমরা
খাও, পান করো, দান করো এবং পরিধান করো—যতক্ষণ না তাতে অপচয় ও অহংকার যুক্ত হয়। (ইবনে মাজাহ শরীফ: ৩৬০৫)
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ فِي الدُّنْيَا
أَلْبَسَهُ اللهُ ثَوْبَ مَذَلَّةٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে
ব্যক্তি লোকদেখানো বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে পোশাক পরিধান করবে, আল্লাহ
তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরিধান করাবেন। (ইবনে মাজাহ শরীফ: ৩৬০৬)
বাড়ি-ঘর
নির্মাণ ও গৃহস্থালি আসবাবপত্র ক্রয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়
করাও অপচয়ের পর্যায়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বলেন:
لَيْسَ لِابْنِ آدَمَ حَقٌّ فِي سِوَى هَذِهِ
الْخِصَالِ: بَيْتٌ يَسْكُنُهُ، وَثَوْبٌ يُوَارِي عَوْرَتَهُ، وَجِلْفُ
الْخُبْزِ وَالْمَاءِ
তিনটি
জিনিস ছাড়া আদম সন্তানের আর কিছুর ওপর মৌলিক অধিকার নেই—বসবাসের জন্য একটি ঘর, লজ্জা নিবারণের জন্য পোশাক এবং
জীবনধারণের জন্য কিছু রুটি ও পানি। (তিরমিযী শরীফ: ২৩৪১)
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ أَنَّ رَسُولَ
اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: فِرَاشٌ لِلرَّجُلِ، وَفِرَاشٌ لِاِمْرَأَتِهِ،
وَالثَّالِثُ لِلضَّيْفِ، وَالرَّابِعُ لِلشَّيْطَانِ
জাবির
ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযি.)
হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: একটি বিছানা পুরুষের নিজের জন্য, একটি তার
স্ত্রীর জন্য, তৃতীয়টি মেহমানের জন্য এবং চতুর্থটি শয়তানের জন্য (অর্থাৎ তা অপচয় ও
অহেতুক)। (মুসলিম শরীফ: ২০৮৪)
ঘ. কথাবার্তায় অপচয়
যে কথায়
দুনিয়া কিংবা আখিরাতের কোনো কল্যাণ নেই, তেমন কথায় সময় ও শক্তির অপচয়
করা মুমিনের শান নয়। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ
مَا لَا يَعْنِيهِ
কোনো
ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো—তার জন্য অনর্থক ও উদ্দেশ্যহীন বিষয় বর্জন করা। (তিরমিযী শরীফ: ২৩১৭)
لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللهِ،
فَإِنَّ كَثْرَةَ الْكَلَامِ بِغَيْرِ ذِكْرِ اللهِ قَسْوَةٌ لِلْقَلْبِ، وَإِنَّ أَبْعَدَ
النَّاسِ مِنَ اللهِ الْقَلْبُ الْقَاسِي
আল্লাহর
জিকির ব্যতীত অধিক কথা বলো না। কেননা আল্লাহর জিকিরহীন অতিরিক্ত কথা অন্তরকে কঠিন
করে দেয়। আর আল্লাহর থেকে দূরতম ব্যক্তি হলো কঠিন অন্তরের অধিকারী। (তিরমিযী শরীফ: ২৪০৫)
إِذَا رَأَيْتُمُ الْعَبْدَ قَدْ أُعْطِيَ زُهْدًا
فِي الدُّنْيَا وَقِلَّةَ مَنْطِقٍ، فَاقْتَرِبُوا مِنْهُ، فَإِنَّهُ يُلْقَى الْحِكْمَةَ
যখন
তোমরা কোনো বান্দাকে দুনিয়াবিমুখতা ও অনর্থক কথা পরিহারের গুণ অর্জিত হতে দেখবে, তখন তার
সান্নিধ্য লাভ করবে;
কারণ তাকে প্রজ্ঞা (হিকমত) দান করা হয়েছে। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী
শরীফ: ৪৬৩১)
مَنْ صَمَتَ نَجَا
যে
ব্যক্তি নীরবতা অবলম্বন করে, সে নাজাত (মুক্তি) পায়। (তিরমিযী শরীফ: ২৫০১)
ঙ. সময়ের অপচয়
সময়
অত্যন্ত অমূল্য সম্পদ। যারা সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করেছে, তারাই
সফলতা অর্জন করেছে। আর যারা সময় নষ্ট করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আল্লাহ
তাআলা সময়ের কসম খেয়ে বলেন:
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ
إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا
بِالصَّبْرِ
কসম
সময়ের! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া—যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং একে অপরকে সত্যের
উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে। (সূরা আল-আসর ১০৩:১-৩)
عَنْ أَبِي بَرْزَةَ الأَسْلَمِيِّ قَالَ:
كَانَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَ العِشَاءِ
وَالحَدِيثَ بَعْدَهَا
রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাতের পূর্বে ঘুমানো এবং এশার পর
অনর্থক গল্প-গুজব করা অপছন্দ করতেন। (বুখারী শরীফ: ৫৬৮)
عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ الأَوْدِيِّ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِرَجُلٍ وَهُوَ يَعِظُهُ:
اغْتَنِمْ
خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ، وَصِحَّتَكَ
قَبْلَ سَقَمِكَ، وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ، وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ، وَحَيَاتَكَ
قَبْلَ مَوْتِكَ
রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে নসিহত করার সময় বলেন: পাঁচটি অবস্থার পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে গনিমত (মূল্যবান সম্পদ) মনে করো—
১. তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে;
২. অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে;
৩. দারিদ্র্য আসার পূর্বে প্রাচুর্যকে;
৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে; এবং
৫. মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনকে। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী
শরীফ: ৯৭৭৫)
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا
قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
نِعْمَتَانِ
مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস (রাযি.)
হতে বর্ণিত, নবী কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই প্রতারিত ও অসচেতন—সুস্থতা এবং অবসর। (বুখারী শরীফ: ৬৪১২)
অপচয়কারীর পরিণাম
ক. অপচয়কারীদের আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন না
পবিত্র
কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
كُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا
حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
যখন তা
ফলবান হয় তখন তা থেকে খাও এবং ফসল তোলার দিনে এর হক (যাকাত/ওশর) প্রদান করো। আর
অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। (সূরা আল-আনআম ৬:১৪১)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا
وَيَكْرَهُ لَكُمْ ثَلَاثًا... وَيَكْرَهُ لَكُمْ قِيلَ
وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ
আবু
হুরায়রা (রাযি.)
হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন—অপ্রয়োজনীয় বাকবিতণ্ডা (অনর্থক কথা), অতিরিক্ত
প্রশ্ন করা এবং সম্পদ বিনষ্ট (অপচয়) করা। (মুসলিম শরীফ: ১৭১৫; আদাবুল
মুফরাদ: ৪৪৪)
খ. অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই
আল্লাহ
তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলে ঘোষণা করেছেন:
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ
كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
এবং
কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই; আর
শয়তান হলো তার রবের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৬-২৭)
গ. অপচয়কারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি
অন্যায়
ও অবৈধ খাতে সম্পদ অপচয়কারীদের কঠিন পরিণাম সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
إِنَّ رِجَالًا يَتَخَوَّضُونَ فِي مَالِ اللهِ
بِغَيْرِ حَقٍّ، فَلَهُمُ النَّارُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
বহু
মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর দেওয়া সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যয় (অপচয়) করে; কিয়ামতের
দিন তাদের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে জাহান্নামের আগুন। (বুখারী শরীফ: ৩১১৮)
ঘ. অপব্যয় হারাম উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করে
অপ্রয়োজনীয়
ব্যয়ের অভ্যাস মানুষকে অর্থসংকটে ফেলে দেয়। ফলে সংসারের অত্যাবশ্যকীয় ব্যয়
নির্বাহ করতে সে হারাম উপার্জনের দিকে ধাবিত হয়। অথচ হারাম খাদ্যে গঠিত দেহ
জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
নিশ্চয়ই
আল্লাহ তাআলা পবিত্র,
তিনি পবিত্র বস্তু ব্যতীত কিছুই গ্রহণ করেন না। (মুসলিম শরীফ: ১০১৫)
كُلُّ جَسَدٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ
أَوْلَى بِهِ
হারাম
উপার্জনে বেড়ে ওঠা প্রতিটি দেহের জন্য জাহান্নামের আগুনই সর্বাধিক উপযোগী। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী
শরীফ: ৫৭৫৯)
অপচয় ও অপব্যয়ের প্রতিকার
ইসলাম
পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ,
বাসস্থান, যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার ও বিবাহ-শাদীসহ জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে অপচয় রোধে সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ক. অর্থ ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন
আল্লাহ
তাআলা বলেন:
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ
وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا
তুমি
তোমার হাত ঘাড়ের সাথে পেঁচিয়ে রেখো না (কৃপণতা করো না) এবং তা একেবারে প্রসারিতও
করো না (অপব্যয় করো না);
তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৯)
রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ اقْتَصَدَ أَغْنَاهُ اللهُ، وَمَنْ بَذَّرَ
أَفْقَرَهُ اللهُ، وَمَنْ تَوَاضَعَ رَفَعَهُ اللهُ، وَمَنْ تَكَبَّرَ قَصَمَهُ اللهُ
যে
ব্যক্তি মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তাকে স্বাবলম্বী করে দেন; যে
অপব্যয় করে, আল্লাহ তাকে দরিদ্র করে দেন; যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন; আর যে
অহংকার করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। (মুসনাদুল বায্যার: ৯৪৬)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى
اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثٌ مُنْجِيَاتٌ، وَثَلَاثٌ مُهْلِكَاتٌ...
فَأَمَّا
الْمُنْجِيَاتُ: فَتَقْوَى اللهِ فِي السِّرِّ وَالْعَلَانِيَةِ، وَالْقَوْلُ
بِالْحَقِّ فِي الرِّضَا وَالْغَضَبِ، وَالْقَصْدُ فِي الْغِنَى وَالْفَقْرِ
তিনটি
বস্তু মানুষকে মুক্তি দেয় এবং তিনটি ধ্বংস করে। মুক্তির পথগুলো হলো:
১. গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করা;
২. সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় সত্য কথা বলা; এবং
৩. ধনাঢ্যতা ও দারিদ্র্য—সর্বাবস্থায় ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী শরীফ: ৭৩১৫)
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ:
قَالَ
رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا عَالَ مَنِ اقْتَصَدَ
যে
ব্যক্তি ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না। (মুসনাদে আহমাদ শরীফ: ৪২৬৯)
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا
وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
এবং যখন
তারা ব্যয় করে তখন তারা অপচয়ও করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা
এ দুয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে। (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৭)
খ. সাজসজ্জা গ্রহণে মিতব্যয়ী হওয়া
সৌন্দর্য
চর্চা ইসলামে বৈধ,
তবে তা যেন সীমালঙ্ঘন বা অপচয়ে রূপ না নেয়। আল্লাহ তাআলা
বলেন:
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ
مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
হে আদম
সন্তান! তোমরা প্রতিটি সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিধান করো। তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু
অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। (সূরা আল-আরাফ ৭:৩১)
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ
نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ
আল্লাহ
তাআলা তাঁর বান্দার ওপর প্রদত্ত নেয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন। (তিরমিযী শরীফ: ২৮১৯)
গ. অহংকার পরিত্যাগ করা
সাধারণত
লোকদেখানো মানসিকতা ও অহংকার থেকেই মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করে। অহংকার
পরিত্যাগ করতে পারলে অপচয় থেকেও বেঁচে থাকা সহজ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا
صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا
يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ
হে
বিশ্বাসীগণ!
খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান-সাদাকাকে বাতিল
করো না—সেই ব্যক্তির মতো, যে কেবল
মানুষের কাছে আত্মপ্রকাশ ও লোকদেখানোর জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও
পরকালে বিশ্বাস করে না। (সূরা আল-বাকারা ২:২৬৪)
ঘ. দুনিয়াবিমুখতা (জুহ্দ) ও সাদাসিধে জীবনযাপন
দুনিয়াবিমুখতা
ও কৃচ্ছ্রসাধন নবী-রাসূলগণের অন্যতম গুণ ছিল। এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় মানসিক
চাহিদা দমন করে সহজ-সরল জীবনযাপন করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) বলেন:
أَلَا تَسْمَعُونَ؟ أَلَا تَسْمَعُونَ؟ إِنَّ
الْبَذَاذَةَ مِنَ الإِيمَانِ، إِنَّ الْبَذَاذَةَ مِنَ الإِيمَانِ
তোমরা কি
শুনছো না? তোমরা কি শুনছো না?
সাদাসিধে জীবনযাপনই ঈমানের অঙ্গ, সাদাসিধে
জীবনযাপনই ঈমানের অঙ্গ! (আবু দাউদ শরীফ: ৪১৬১)
ঙ. দান-সাদাকার অভ্যাস গড়ে তোলা
মৃত্যুর
পূর্বেই অর্জিত সম্পদ থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ
তাআলা বলেন:
وَأَنْفِقُوا مِنْ مَا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ
أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ
قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِنَ الصَّالِحِينَ وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللهُ نَفْسًا
إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا
আর
মৃত্যু আসার পূর্বেই আমার দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে: হে আমার রব!
আমাকে আর কিছুটা সময় দিলে না কেন? তাহলে
আমি সাদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। অথচ কারো নির্ধারিত সময় এসে
গেলে আল্লাহ কাউকেই সুযোগ সম্প্রসারিত করেন না। (সূরা আল-মুনাফিকুন
৬৩:১০-১১)
الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى،
فَالْيَدُ الْعُلْيَا هِيَ المُنْفِقَةُ، وَالسُّفْلَى هِيَ السَّائِلَةُ
নিচের
হাত অপেক্ষা উপরের হাত উত্তম। আর উপরের হাত হলো দাতার হাত, এবং
নিচের হাত হলো গ্রহীতার হাত। (বুখারী শরীফ: ১৪২৯)
উপসংহার
অপচয়ের
ব্যাধি সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। জেনে বা না জেনে
অনেকে এতে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টি কুড়াচ্ছে, অথচ ইসলাম অপচয় ও অপব্যয়কে
সম্পূর্ণরূপে হারাম করেছে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনো অপচয়ে লিপ্ত হতে পারে না।
অপচয় রোধের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে নিজের মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে।
ব্যক্তিবর্গ যখন স্বয়ং অপচয় না করার সংকল্প করবে এবং পরকালীন হিসাব-নিকাশের চেতনায়
উজ্জীবিত হবে, তখনই অপচয় বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া জাতীয় সম্পদ, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ
সার্বিক প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষায় সাশ্রয়ী হওয়া আমাদের দ্বীনি ও নাগরিক
দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক অনুধাবন ও আমল করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।
