প্রচলিত যুদ্ধ বনাম ইসলামী যুদ্ধনীতি | জুমুয়ার খুতবা
![]() |
প্রচলিত
যুদ্ধ বনাম ইসলামী যুদ্ধনীতি |
ভূমিকাঃ আজকের বিশ্ব এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে যুদ্ধ আজ কেবল সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পারমাণবিক অস্ত্র, ড্রোন হামলা আর অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে সাধারণ নারী ও শিশুরাও এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছে। একদিকে তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার "Total War" (সর্বাত্মক ধ্বংস), অন্যদিকে ১৪০০ বছর আগে ইসলামের দেওয়া "Siyar" বা যুদ্ধনীতি। ইসলাম যুদ্ধকে কখনোই শখ বা বীরত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম বানায়নি, বরং একে একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং নিয়ন্ত্রিত কাঠামো দান করেছে। আজ আমরা ইসলামের সেই মহান যুদ্ধনীতি ও প্রচলিত যুদ্ধের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করব।
১. যুদ্ধের উদ্দেশ্য:
আধিপত্য বনাম ন্যায় প্রতিষ্ঠা
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের পেছনে থাকে
মূলত ক্ষমতা ও অর্থনীতি। কিন্তু ইসলামে যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হলো জুলুমের অবসান ঘটানো।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ
يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا
وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا
"তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেই অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করছ না, যারা বলে—‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই জালিম জনপদ থেকে বের করে নাও, এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক ও একজন সাহায্যকারী
নির্ধারণ কর।" (সূরা আন-নিসা ৪:৭৫)
বাস্তব উদাহরণ: মক্কা
বিজয়
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ রক্তপাতের বদলে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
করেন। তিনি বলেছিলেন:
لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ،
يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ، وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ
الطُّلَقَاءُ.
"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ
নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন... তোমরা যাও, তোমরা আজ মুক্ত।" (আস-সুনানুল কুবরা, বায়হাকী: ১৮২৭২)
২. যুদ্ধ শুরু করার
নীতি: আগ্রাসন নয়, প্রতিরক্ষা
ইসলাম কখনো আগ বাড়িয়ে আক্রমণ সমর্থন
করে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ
الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ
الْمُعْتَدِينَ
"তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে
যুদ্ধ কর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।"
(সূরা আল-বাকারা ২:১৯০)
বাস্তব উদাহরণ: খন্দকের
যুদ্ধ
আরবের সম্মিলিত বাহিনী যখন মদিনা ধ্বংস
করতে এলো,
তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার চারপাশে গর্ত (খন্দক) খুঁড়ে
কেবল আত্মরক্ষার কৌশল নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৪১০১-৪১০৩)
৩. নিরপরাধদের নিরাপত্তা:
ইসলামের মানবিক বিপ্লব
আজকের বিশ্বে যুদ্ধ মানেই বেসামরিক
মৃত্যু,
কিন্তু ইসলামে এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ قَتْلِ
النِّسَاءِ وَالصِّبْيَانِ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।" (সহিহ বুখারি: ৩০১৫)
খলিফা আবু বকর (রা.)-এর
১০টি ঐতিহাসিক নির্দেশনা:
ওসামা বিন জায়েদ (রা.)-এর বাহিনী পাঠানোর
সময় তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قِفُوا أُوصِيكُمْ بِعَشْرٍ
فَاحْفَظُوهَا عَنِّي: لَا تَخُونُوا، وَلَا تَغُلُّوا، وَلَا تَغْدِرُوا، وَلَا
تَمْثُلُوا، وَلَا تَقْتُلُوا طِفْلًا صَغِيرًا، وَلَا شَيْخًا كَبِيرًا، وَلَا
امْرَأَةً، وَلَا تَعْقِرُوا نَخْلًا وَلَا تُحْرِقُوهُ، وَلَا تَقْطَعُوا
شَجَرَةً مُثْمِرَةً، وَلَا تَذْبَحُوا شَاةً وَلَا بَقَرَةً وَلَا بَعِيرًا
إِلَّا لِمَأْكُلَةٍ.
হে লোকসকল! থামো, আমি তোমাদের ১০টি বিষয়ে অসিয়ত করছি, তোমরা তা আমার পক্ষ থেকে মুখস্থ করে নাও: ১. বিশ্বাসভঙ্গ করো
না (খিয়ানত করো না)। ২. গণিমতের মাল চুরি করো না। ৩. বিশ্বাসঘাতকতা করো না। ৪. মরদেহের
বিকৃতি (মুতলা) ঘটাবে না। ৫. কোনো শিশুকে হত্যা করবে না। ৬. কোনো বৃদ্ধকে হত্যা করবে
না। ৭. কোনো নারীকে হত্যা করবে না। ৮. কোনো খেজুর গাছ উপড়াবে না বা পুড়িয়ে দেবে না।
৯. কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটবে না। ১০. প্রয়োজন (খাবার) ছাড়া কোনো ছাগল, গরু বা উট জবাই করবে না।
মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, কিতাবুল জিহাদ, হাদিস নং: ৯৬৫।
আধুনিক 'জেনেভা কনভেনশন' (১৮৬৪) যা চেষ্টা
করেছে, ইসলাম
তার ১২০০ বছর আগেই তা বাস্তবায়ন করেছে।
৪. যুদ্ধবন্দীদের সাথে
আচরণ: প্রতিশোধ নয়, মানবিকতা
ইসলামে বন্দীদের সাথে আচরণ একটি ইবাদত।
আল্লাহ বলেন:
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَىٰ
حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
"তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীদের খাবার দান করে।" (সূরা আল-ইনসান ৭৬:৮)
বাস্তব উদাহরণ: বদর
যুদ্ধ
বন্দী আবু আজিজ (রা.) বর্ণনা করেন:
كَانُوا إِذَا قَدَّمُوا غَدَاءَهُمْ
أَوْ عَشَاءَهُمْ خَصُّونِي بِالْخُبْزِ، وَأَكَلُوا التَّمْرَ...
"সাহাবারা নিজেরা খেজুর খেতেন
আর আমাদের (বন্দীদের) ভালো রুটি খাওয়াতেন।" (আল-মু'জামুল কাবির, তাবারানি: ৯৭৭)
৫. চুক্তি রক্ষা ও বিশ্বাসযোগ্যতা
চুক্তি রক্ষা করা ইসলামী যুদ্ধের অপরিহার্য
শর্ত। আল্লাহ বলেন:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ
الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
"তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই
অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৪)
বাস্তব উদাহরণ: উমর
(রা.) ও জেরুজালেম বিজয়
খলিফা উমর (রা.) জেরুজালেমবাসীদের
জান-মালের নিরাপত্তার জন্য যে 'আহদ আল-উমারিয়া' চুক্তি করেছিলেন, তা আজও ইতিহাসে অমর। তিনি গির্জার ভেতরে নামাজ পড়েননি যাতে ভবিষ্যতে মুসলিমরা তা
দখল না করে। (তারিখুত তাবারী, ২য় খণ্ড, ৪৪৯ পৃষ্ঠা)
৬. শান্তির প্রতি অগ্রাধিকার
ইসলাম যুদ্ধকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখে।
আল্লাহ বলেন:
وَإِن جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ
لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ
"যদি শত্রু শান্তির দিকে ঝুঁকে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ো।" (সূরা আল-আনফাল ৮:৬১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চিরন্তন উপদেশ:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ، لَا
تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ، وَاسْأَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ...
"হে লোকসকল! তোমরা শত্রুর মুখোমুখি
হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না, বরং আল্লাহর কাছে
নিরাপত্তা (শান্তি) প্রার্থনা করো।" (সহিহ বুখারি: ২৯৬৫)
উপসংহার
ইসলামী যুদ্ধনীতি
আমাদের শেখায়—ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই হতে পারে, কিন্তু সেই লড়াইয়েও যেন মানবিকতা ও নৈতিকতা বজায় থাকে। আধুনিক
বিশ্ব যখন যুদ্ধের নামে ধ্বংসলীলায় মেতেছে, তখন ইসলামের এই আদর্শই পারে পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনতে। আল্লাহ আমাদের
সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
খুতবাটির পিডিএফ (PDF) ডাউনলোড করুন
সহজেই পড়ার বা প্রিন্ট করার জন্য নিচের বাটনে ক্লিক করে খুতবাটি সংগ্রহ করুন।
📥 সরাসরি ডাউনলোড করুনফাইল সাইজ: PDF ফরম্যাট
